তাসনিমুল হাসান প্রান্তঃ
রমজান মাস মুমিনের জীবনে আসে আত্মশুদ্ধি, সংযম ও স্রষ্টার প্রতি নিরঙ্কুশ আত্মসমর্পণের মহান বার্তা নিয়ে। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার এই বিধান কেবল স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি গভীর সামাজিক ও মানবিক দর্শন রয়েছে। এই মাস আমাদের শেখায় ক্ষুধার তীব্র কষ্ট উপলব্ধি করতে, ধৈর্য ধারণ করতে এবং সমাজের বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মী হতে। কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রমজানের এই মূল চেতনার জায়গাটি ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে জাঁকজমকপূর্ণ ইফতার পার্টির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
সারাদিন রোজা রাখার পর পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজনদের সঙ্গে বসে ইফতার করা নিঃসন্দেহে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ায়। এটি রোজাদারের জন্য পরম আনন্দের এবং ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যখন এই আয়োজন বিলাসবহুল হোটেল, রাজনৈতিক প্রদর্শনী কিংবা সামাজিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা আর ইবাদতের পবিত্রতা বহন করে না। বড় বড় কনভেনশন হল বা পাঁচতারা হোটেলে কর্পোরেট ও রাজনৈতিক ইফতার পার্টির নামে যে বিপুল অর্থের শ্রাদ্ধ ও খাবারের অপচয় হয়, তা যেন রমজানের প্রকৃত শিক্ষা থেকে আমাদের যোজন যোজন দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করলে এই বৈষম্য আরও প্রকটভাবে চোখে পড়ে। বাজারের প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যখন আকাশছোঁয়া, তখন দেশের অসংখ্য নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার রমজান মাসে সেহরি ও ইফতারের ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকু করতে হিমশিম খাচ্ছে। একদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্য সব মিলিয়ে অনেকের ঘরেই ইফতার মানে কেবল এক গ্লাস পানি, একটু মুড়ি আর সামান্য ছোলা। অন্যদিকে একই সমাজের অন্য প্রান্তে হাজার হাজার বা লাখ টাকা ব্যয়ের ইফতার পার্টিতে দেখা যায় শত পদের খাবারের পসরা, যার একটি বড় অংশই দিন শেষে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়। এই নির্মম বৈষম্য কি আমাদের বিবেককে একটুও নাড়া দেয় না?
রমজানের শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উপবাস বা ইবাদতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতারও জোরালো আহ্বান জানায়। ইসলামে অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, 'নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।' অথচ আমরা জেনেবুঝেই এই অপচয়ের মহোৎসবে মেতে উঠছি।
যাকাত, সদকা ও ফিতরা এসব বিধান কেবল কোনো প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সমাজের সম্পদের সুষম বণ্টনের এক অনন্য ব্যবস্থা। অথচ আমরা প্রায়ই দেখি, বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি ইফতার মাহফিলের বিশাল ব্যানার, ফেস্টুন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। লোকদেখানো এই দানের পেছনে আর্তের সেবার চেয়ে আত্মপ্রচারের নেশাই বেশি কাজ করে। নীরবে সাহায্যের হাত বাড়ানো মানুষগুলো সেখানে অনেকটাই ব্রাত্য। কিন্তু ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে গোপনে দান করতে; যেখানে ডান হাত কী দেয়, বাম হাতও তা যেন জানতে না পারে।
ইফতার পার্টি যে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিতে হবে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বরং প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। অপ্রয়োজনীয় জাঁকজমক ও অপচয় পরিহার করে সেই অর্থের একটি বড় অংশ সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা যেতে পারে। একটু ভেবে দেখুন তো, একজন সামর্থ্যবান ব্যক্তি বা কোনো প্রতিষ্ঠান একটি বিলাসী ইফতার পার্টির আয়োজন না করে সেই বাজেট দিয়ে যদি দশটি অসহায় পরিবারের পুরো এক মাসের খাবারের দায়িত্ব নেন, তবে কি সমাজটা আরও সুন্দর হতো না?
পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে সাদামাটা আয়োজনের পাশাপাশি এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম বা পথশিশুদের মাঝে ইফতার বিতরণ করলে রমজানের আনন্দ অনেক বেশি অর্থবহ হয়ে উঠবে। আমাদের চারপাশেই এমন অনেক অভাবী আত্মীয় বা প্রতিবেশী আছেন, যারা লজ্জায় কারও কাছে হাত পাততে পারেন না। উৎসবের এই বাজেটের একটি অংশ যদি গোপনে তাদের হাতে তুলে দেওয়া যায়, তবে সেটিই হবে রমজানের প্রকৃত চেতনার প্রতিফলন।
রমজান মূলত আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়। আমরা কি সত্যিই সংযম শিখছি, নাকি কেবল ভিন্ন রূপে ভোগবাদকেই আঁকড়ে ধরছি এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রত্যেকের বিবেকের আয়নায় খুঁজতে হবে। আসুন, এই রমজানে অঙ্গীকার করি অপচয়ের নয়, বরং সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলবো। ইফতার পার্টির প্রতিযোগিতা নয়, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হোক আমাদের সত্যিকারের আয়োজন। কেবল তখনই রমজান একটি প্রথাগত ধর্মীয় আচারের গণ্ডি পেরিয়ে এক মানবিক বিপ্লবের সূচনা করবে। আলোকিত হবে আমাদের সমাজ, জাগ্রত হবে মানবতা।