দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর পশ্চিম আকাশে যখন এক চিলতে বাঁকা চাঁদ উঁকি দেয়, তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত আনন্দ আর উন্মাদনা। নতুন পোশাক, সুবাসিত খাবার আর আপনজনদের সান্নিধ্য সব মিলিয়ে ঈদ যেন এক সর্বজনীন উৎসবের ডাক দিয়ে যায়। তাত্ত্বিকভাবে কথাটি দারুণ শোনালেও, খোলস ছেড়ে আমাদের চারপাশের রূঢ় বাস্তবতার দিকে তাকালে একটি অনিবার্য প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে ঈদের এই আনন্দ কি সত্যিই সমাজের প্রতিটি ঘরে সমানভাবে পৌঁছায়?
আমাদের চারপাশের চিত্রটি বড়ই সাংঘর্ষিক। ঈদের আগে শহরের অভিজাত শপিংমলগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। নতুন ফ্যাশনের পোশাক আর বিলাসবহুল সামগ্রী কেনার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতায় মাতে মানুষ। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কাছে ঈদ মানেই উদ্যাপন আর আতিশয্যের এক পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ।
কিন্তু ঠিক সেই সময়েই শহরের কোনো এক বস্তির স্যাঁতসেঁতে ঘরে, কিংবা গ্রামের কোনো এক ভাঙা টিনের নিচে চলে আরেক রকমের হিসাব-নিকাশ। দেশের যে বিশাল অংশটি দিনমজুর, রিকশাচালক, কৃষিশ্রমিক কিংবা নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী তাদের কাছে ঈদ মানেই এক বুকচাপা দীর্ঘশ্বাস আর বাড়তি দুশ্চিন্তা। নিত্যদিনের দুই বেলা খাবার জোগাতেই যাদের নাভিশ্বাস ওঠে, উৎসবের বাড়তি খরচ তাদের কাছে আনন্দের চেয়ে অদৃশ্য এক বোঝাই হয়েই বেশি দেখা দেয়।
ঈদের আগের দিনগুলোর দিকে একটু গভীরভাবে তাকালেই এই বৈষম্যের ক্ষতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সন্তানের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটাতে একজন রিকশাচালক বাবা হয়তো চাঁদরাতের গভীর প্রহর পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন। নিজের জন্য একটি সুতোও কেনেন না, সমস্ত উপার্জন জমিয়ে সন্তানের হাতে তুলে দেন নতুন একটি জামা। অভাবের সংসারে একজন মা হয়তো নিজের বহু পুরোনো শাড়িটিই যত্ন করে ধুয়ে-ইস্ত্রি করে তুলে রাখেন ঈদের সকালের জন্য। নিজেদের না-পাওয়াগুলোকে সযত্নে লুকিয়ে তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করেন সন্তানের আনন্দটুকু যেন ম্লান না হয়।
খাবারের পাতেও থাকে এই বৈষম্যের স্পষ্ট ছাপ। কারও ডাইনিং টেবিলে যখন কোরমা-পোলাওয়ের সুবাস ভাসে, তখন অনেক দরিদ্র পরিবারের ঈদের দিনটিও কাটে সাধারণ ডাল-ভাত বা অতি সামান্য আয়োজনে। পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে দেখা যায়, দেশের একটি বড় অংশের মানুষ আজও নিম্নআয়ের সীমারেখায় সংগ্রাম করছে। সম্পদের এই তীব্র অসম বণ্টনের কারণে আমাদের উৎসবের আনন্দও আজ নির্মমভাবে শ্রেণিবৈষম্যের শিকার।
তবে এত নৈরাশ্যের মাঝেও মানবিকতার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। ঈদের সময় অনেক হৃদয়বান ব্যক্তি, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ায়। নতুন পোশাক বিতরণ বা খাদ্যসামগ্রী দিয়ে অন্তত ঈদের দিনটুকু রাঙিয়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু উৎসবের এই বৈষম্য কেবল অনুদান দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন।
বস্তুত, ইসলামের মূল শিক্ষাও এটিই। ঈদের আনন্দ কেবল আত্মকেন্দ্রিক ভোগের জন্য নয়, বরং তা ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত। যাকাত, ফিতরা ও সাদাকার মতো চমৎকার সব অর্থনৈতিক বিধান দেওয়া হয়েছে সমাজ থেকে এই বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্যই। কিন্তু আমরা কি সত্যিই এর মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পেরেছি? সমাজের প্রতিটি সামর্থ্যবান ব্যক্তি যদি তাঁর দায়িত্বটুকু আন্তরিকতার সাথে পালন করতেন, তবে হয়তো অভাবের তাড়নায় কাউকে উৎসবের দিন মুখ লুকিয়ে কাঁদতে হতো না।
ঈদ শুধু নতুন জামা বা দামি খাবারের প্রদর্শনী নয়; ঈদ হলো সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক গভীর দর্শন। পাশের ঘরের মানুষটি যদি অনাহারে বা কষ্টে থাকে, তবে নিজের ঘরের উৎসব কখনোই পূর্ণতা পেতে পারে না।
সময় এসেছে নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করার আমরা কি চাই ঈদের এই আনন্দ কেবল কিছু সুবিধাভোগীর ঘরেই বন্দি থাকুক? নাকি তা ছড়িয়ে পড়ুক সমাজের প্রতিটি মানুষের আঙিনায়? ঈদের সত্যিকারের সৌন্দর্য ও সার্থকতা লুকিয়ে আছে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মাঝেই।
লেখক:
তাসনিমুল হাসান প্রান্ত
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ডিবিএন ডেস্ক